সংবাদ প্রকাশ করায় সাংবাদিকদের হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন সেই শোকজকৃত শিক্ষক নাফসি তালুকদার
স্যার প্রতিদিন দেরিতে আসে ক্লাসে” এমন মন্তব্য করায় ৩৩ জন শিক্ষার্থীকে নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত কালাই ময়েন উদ্দিন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শোকজকৃত সহকারি শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান) এম এ জি নাফসি তালুকদারের বিরুদ্ধে এবার সাংবাদিকদের হত্যার হুমকিসহ বিভিন্ন মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেয়ার অভিযোগ ঊঠেছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা ।
স্থানীয় সাংবাদিকরা জানান, বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ৩৩ জন শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনাটি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার পর থেকে শিক্ষক নাফসি তালুকদার ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। এরপর মুঠোফোনসহ বিভিন্নভাবে তিনি সংশ্লিষ্ট কয়েকজন সংবাদকর্মী ও তাদের পরিবারকে স্ব-শরীরে হুমকি দেন। সাংবাদিক মহল বলছে, শিক্ষার্থীদের নির্যাতন ও অন্যায় কর্মকান্ড ধামাচাপা দিতে গিয়ে এখন সংবাদকর্মীদের ভয় দেখানো হচ্ছে, যা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার উপর সরাসরি আঘাত। তারা অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

দৈনিক বাংলা ও নিউজ বাংলা২৪ এর জেলা প্রতিনিধি রাব্বিউল হাসান রমি, নাগরিক টেলিভিশন ও দৈনিক শিক্ষাডটকম এর জেলা প্রতিনিধি মাহফুজার রহমান, দৈনিক ভোরের দর্পনের জেলা প্রতিনিধি কাজী তানভিরুল ইসলাম রিগানের স্ত্রী এবং এনটিভি অনলাইন ও
দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ এর কালাই প্রতিনিধি সজিবুল ইসলাম পাভেলকে মুঠোফোনে হুমকি দেন। এছাড়াও কালাই বাসস্ট্যান্ড এলাকায় গত ২৬ আগস্ট ও ২৭ আগস্ট আরো কয়েকজন সাংবাদিককে সরাসরি বিভিন্ন রকম হুমকি দেন।
এ ঘটনা নিয়ে রাব্বিউল হাসান রমি তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক একাউন্টে ক্ষোভ প্রকাশ করে খোলা চিঠিতে লেখেন— “নিউজ করায় ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করায় আমাকে কিছুক্ষণ আগে মেরে ফেলে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন কালাই ময়েন উদ্দিন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ও সাবেক পৌর যুবদলের সভাপতি নাফসি তালুকদার। আমার জীবনে কোন ক্ষতি ও পরিবারের কোন ক্ষতি হলে তার দায়ভার নাফসি তালুকদারকে নিতে হবে। গতকাল যারা তার ব্যবহার নিয়ে মুখে ফেনা তুলছেন, আজ তারা কি বলবেন?’
এছাড়াও দৈনিক কালের কণ্ঠের কালাই প্রতিনিধি সউদ আব্দুল্লাহ তার ফেসবুকে দুঃখ প্রকাশ করে লেখেন—সাংবাদিকতায় সত্য বলার দায়, এখন ভয়! সমাজের আয়নায় এক ভয়ানক প্রতিচ্ছবি! পরিবার ও সাংবাদিকতা পেশার ঝুঁকি নিয়ে বিস্তর বিবৃতি দিয়েছেন তিনি।
হুমকি পাওয়া নাগরিক টেলিভিশনের জয়পুরহাট প্রতিনিধি মাহফুজ রহমান বলেন, সংবাদ প্রকাশের পর অভিযুক্ত শিক্ষক নাফসি তালুকদার আমাকে ফোন দিয়ে হুমকি দিয়েছে। সত্য সংবাদ প্রকাশ করতে গিয়ে এ ধরনের হুমকি মুক্ত সাংবাদিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
হুমকি পাওয়া এনটিভি অনলাইনের কালাই-ক্ষেতলাল-আক্কেলপুর প্রতিনিধি ও দৈনিক রূপালী বাংলাদেশের কালাই প্রতিনিধি সজিবুল ইসলাম পাভেল বলেন, সংবাদ প্রকাশের জেরে অভিযুক্ত শিক্ষক নাফসি তালুকদার আমাকে ফোন করে ডাকাতি মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়ার হুমকি দেয়। এ ধরনের আচরণ একজন শিক্ষকের কাছে আমরা আশা করি না।

হুমকির বিষয়ে আরও কয়েকজন স্থানীয় বিভিন্ন গনমাধ্যমের সাংবাদিকরা বলেন, আমরা শুধুমাত্র শিক্ষার্থী ও অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কারণ দর্শানোর নোটিশ, তথ্য ও ভিডিও বক্তব্য অনুযায়ী সংবাদটি স্ব-স্ব মিডিয়াতে পাঠিয়েছি। যা মিডিয়া কর্তৃপক্ষ যাচাই বাচাই করে প্রকাশ করেছে। অথচ নাফসি তালুকদার এখন আমাদের বিভিন্নভাবে হুমকি ও ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। এতে আমরা পেশাগতভাবে মারাত্মক নিরাপত্তাহীনতা ও ঝুঁকির মধ্যে আছি। এসব নিউজ সংক্রান্ত কোন তথ্যাদির বিষয়ে নাফসি তালুকদার যদি সংক্ষুব্ধ হন তিনি প্রতিবাদ জানাতে পারেন। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা দিতে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহবানও জানান তারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, স্কুলটি সরকারি হওয়ার আগে নাফসি তালুকদার একটি রাজনৈতিক দলের নেতা ছিল। সেই প্রভাবেই এখনও প্রভাব বিস্তার করছেন স্কুলসহ সর্বমহলে।
জয়পুরহাট প্রেসক্লাবের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সদস্য জানান, শিক্ষক নাফসি তালুকদারের হুমকি দেওয়ার বিষয়টি তারা গুরুত্বের সাথে দেখছেন। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান তারা।
সাংবাদিক নেতারা বলছেন, শিক্ষার্থীদের নির্যাতন ও অন্যায় কর্মকাণ্ড ধামাচাপা দিতে গিয়ে এখন সংবাদকর্মীদের ভয় দেখানো হচ্ছে, যা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার উপর সরাসরি আঘাত। তারা অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এ ব্যাপারে জানতে অভিযুক্ত শিক্ষক নাফসি তালুকদারের মুঠোফোনে একাধিক সাংবাদিক কয়েকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
কালাই থানার অফিসার ইনচার্জ জাহিদ হোসেন বলেন, আমি ছিলাম না। তবে সাংবাদিকদের বিষয়ে আমি শুনেছি। যারা ভুক্তভোগী তারা লিখিত অভিযোগ দিলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কালাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা আক্তার জাহান বলেন, ইতিমধ্যে স্কুলের ব্যাপারে কারণ দর্শানোর জবাব পেয়েছি। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে হাসপাতালের ডাক্তার, নার্স, সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ অন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সাথে অসদাচরণ ও এসিল্যান্ডের সঙ্গেও অসৎ আচরণের অভিযোগ রয়েছে। এর সাথে সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলে তদন্ত করে ডিজির কাছে পাঠানো হবে।
জয়পুরহাট পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুল ওহাব বলেন, সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়ার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো থানায় জিডি বা কোনো অভিযোগ হয়নি। তবে একজন সাংবাদিক ফোন করে বিষয়টি বলেছে। আমি তাকে থানায় জিডি করতে বলেছি।
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার (২৬ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টা ৪০ মিনিটের দিকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের উপর বেত্রাঘাত করার অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষককে শোকজ করে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। একইসঙ্গে তার বিরুদ্ধে সরকারি জায়গা দখল করে দলীয় অফিস খোলা, সহকর্মী শিক্ষক ও ডাক্তার-নার্সদের সাথে খারাপ ব্যবহারসহ একাধিক অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে।








আপনার মতামত লিখুন