নেপালের প্রধানমন্ত্রীকে হাসিনার মতই পালাতে হলো যে কারণে
মাত্র এক বছর আগেই চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের স্রোতে ৫ই আগস্ট যেভাবে ক্ষমতা ছেড়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে চড়ে পালিয়েছেন, ঠিক একইভাবে আজ ৯ সেপ্টেম্বর একই সময়ে হেলিকপ্টারে চড়েই পালালেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী ওলি।
পলাতক হাসিনার মতো ওলিও শেষ পর্যন্ত ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিবেন কিনা, কিংবা ভারত তাকে শেখ হাসিনার মতো পরম আদরে আশ্রয় দিবে কিনা; সেটাই এখন দেখার বিষয়।
তবে হাসিনা তার দলের মন্ত্রী-এমপি-নেতাদের মহাবিপদে ফেলে শুধু নিজের বোনকে নিয়ে একাই পালিয়েছিলেন। পক্ষান্তরে নেপালের প্রধানমন্ত্রী ওলি ৭জন মন্ত্রীকে নিয়ে পালিয়েছেণ
দুইটা আলাদা দেশ। কিন্তু দৃশ্যপট একই। বিপ্লবের স্টাইলও এক। পরিণতিও এক। মনে হচ্ছে একই পরিচালকের পরিচালনায় একই স্ক্রিপ্টে নির্মিত এক টিকিটে দেখার মতো দুটি সিনেমা।
আজ ৯ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার দুপুর নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি ব্যাপক বিক্ষোভ–সহিংসতার মধ্যে পদত্যাগ করেছেন এবং ৯জন মন্ত্রীকে নিয়ে হেলিকপ্টারে চড়ে পালিয়েছেন।
নেপালে গণবিক্ষোভের সূত্রপাত হয় সরকারের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষেধাজ্ঞা ও দীর্ঘদিনের দুর্নীতি–বিরোধী ক্ষোভ থেকে। আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল তরুণ–প্রজন্ম, যা গণমাধ্যমে “জেন-জি প্রোটেস্ট’’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
বিক্ষোভে গতকাল সোমবার ১৯ জন এবং আজ অন্তত ২ জন নিহত হয়েছেন।পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটায় সরকার জরুরি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয় এবং শেষ পর্যন্ত ওলি পদত্যাগ করে বিশেষ হেলিকপ্টারে চড়ে পালিয়ে গেছেন।
এরপরও উপপ্রধানমন্ত্রীকে গণধোলাই এবং সংসদ ভবন,সুপ্রিমকোর্ট পুড়িয়ে দিয়েছে বিক্ষুব্ধ জনতা। কাঠমান্ডুসহ বিভিন্ন স্থানে সরকার–দলীয় নেতাদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। দেশটির সেনাবাহিনী এখন ক্ষমতা নিয়েছে।
নেপালের গণবিপ্লকের কারণ এবং ফলাফল নিয়ে এই প্রবন্ধে আরো যে সব বিষয় বিশ্লেষণ করা হয়েছে,তা হলো-
(ক) নেপালে কেন বিক্ষোভ এত দ্রুত ও ধর্ষণাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়ল ?
(খ) ওলির পদত্যাগের পেছনের তাত্ক্ষণিক ও কাঠামোগত কারণগুলো কী, এবং (গ) সংবিধানিক প্রক্রিয়া ও দলীয় অঙ্কের বাস্তবতায় নেপালের সামনে কী কী ?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা
সরকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর রেজিস্ট্রেশন ও রেগুলেশন আরোপের উদ্যোগ নেয়; এর পরপরই কয়েকটি প্ল্যাটফর্ম বন্ধ হয়ে যায়। নাগরিক অধিকার অঙ্গন ও তরুণদের বড় অংশ এটিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখে পথে নামে।
সহিংসতার বিস্তার
গত ৮ সেপ্টেম্বর আন্দোলন চরমে পৌঁছায়; পুলিশ–বিক্ষোভকারীর সংঘর্ষে অন্তত ১৯ জন নিহত হয়, শতাধিক আহত—এর অধিকাংশই কাঠমান্ডুতে। পরদিনও বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে, কারফিউ সত্ত্বেও জনতা রাস্তায় নামে, সরকারি ভবন, দলীয় নেতাদের বাড়িতে হামলা–অগ্নিসংযোগ হয়।
রাজনৈতিক সংকট ও পদত্যাগ
চাপে পড়ে সরকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করলেও জনরোষ থামেনি। ৯ সেপ্টেম্বর বিকালে কেপি শর্মা ওলি পদত্যাগ করেন।
বিক্ষোভের কারণ
প্রথমত: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ–নিষেধাজ্ঞা: স্বাধীনতার প্রশ্ন
সরকারের যুক্তি ছিল ভুয়া তথ্য রোধ, অনলাইন অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং “দায়িত্বশীল সোশ্যাল মিডিয়া” নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটারসহ একাধিক প্ল্যাটফর্ম ব্লক হওয়ায় এটি দ্রুতই সেন্সরশিপ বিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়।
তরুণ প্রজন্ম ডিজিটাল স্পেসকে তাদের রাজনৈতিক-সামাজিক অংশগ্রহণের কেন্দ্র হিসেবে দেখে; ফলে এ নিষেধাজ্ঞা তাদের ক্ষমতায়ন উপকরণে সরাসরি আঘাত হিসেবে প্রতিভাত হয়।
দ্বিতীয়ত: দুর্নীতিবিরোধী ক্ষোভের সঞ্চয়
বছরের পর বছর ধরে নেপালে দুর্নীতি, পক্ষপাতদুষ্টতা, অব্যবস্থাপনা নিয়ে জনঅসন্তোষ বেড়েছে। সরকারি নিয়োগ, অবকাঠামো ব্যয়, ক্রয়–প্রক্রিয়া ইত্যাদি খাতে জবাবদিহিতার অভাব ও ক্ষমতাসীন–রাজনীতিকদের প্রভাবের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। সোশ্যাল–মিডিয়া নিষেধাজ্ঞা সেই ক্ষোভের উপর যেন ট্রিগার হিসেবে কাজ করেছে।“ডিজিটাল অধিকার এবং দুর্নীতি বিরোধিতা” এক হয়ে বড় জনসমর্থন পেয়েছে।
তৃতীয়ত: বলপ্রয়োগ ও কারফিউ
কারফিউ জারি, রাবার বুলেট ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহার, গুলিবর্ষণ-এই কড়া প্রতিক্রিয়ায় হতাহতের সংখ্যা বেড়ে গেলে বিক্ষোভকারীদের যুক্তি আরও জোরদার হয় এবং মধ্যপন্থী–অনাগ্রহীদের একাংশও আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে।
ইতিহাস বলে, নেপালের মতো দেশগুলোতে জনতার আন্দোলন দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ প্রায়ই উল্টো ফল আনে। জনমতের বিক্ষোভ প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
চতুর্থত: রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার দীর্ঘ ঐতিহ্য
২০০৮ সালে রাজতন্ত্রের অবসানের পর থেকে নেপাল ধারাবাহিক জোট রাজনীতি, দোলাচল ও ঘনঘন নেতৃত্ব পরিবর্তনের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেছে।
২০২২ সালের নির্বাচনের পরের টালমাটাল জোটের হিসাব-নিকাশ , ২০২৪ সালে দহল সরকারের পতন, এবং ওলির নেতৃত্বে নতুন জোট,সবই দেখিয়েছে যে দলীয় আস্থা ও নীতিগত ধারাবাহিকতা দুর্বল। তরুণরা রাজনীতির এই “সুইচিং গেম”কে “স্ট্যাটাসকো এলিট প্যাক্ট” হিসেবে দেখছে।
বিপ্লবের রাজনৈতিক ক্যালকুলাস
১. সংকট ব্যবস্থাপনায় ভুল বার্তা
সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সরকারের বারবার ব্যাখ্যা বদল, আংশিক ব্লক উত্তোলন, কিন্তু একই সাথে কড়া দমনে নীতিগত স্পষ্টতা অনুপস্থিত ছিল। ফলত: সরকার “নাগরিক স্বাধীনতা বনাম রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ” এই ফ্রেমে জনমত হারিয়ে ফেলেছে।
২. জেন–জেডের সংগঠনক্ষমতা ও মোবিলাইজেশন
তরুণরা ক্যাম্পাস, টিকটক, শর্ট–ভিডিও এবং এনক্রিপ্টেড মেসেজিং সবকিছু মিলিয়ে রাস্তায় নেমেছে। নেপালের আরবানাইজড ভ্যালি পলিটিক্সে এই দ্রুত মোবিলাইজেশন সরকারকে অবাক করেছে। সোশ্যাল–মিডিয়া ব্লক উল্টো স্ট্রাইস্যান্ড এফেক্ট তৈরি করেছে। মানুষ আরও যতো বেশি তথ্য খুঁজেছে, বিক্ষোভও ততই বেড়েছে।
৩. প্রতিযোগী দলগুলোর পজিশনিং
অভিযোগ, বিরোধীদলসহ বহু রাজনীতিক এই তরুণ–ক্ষোভকে নিজেদের কৌশলগত সুবিধায় ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে। কমবেশি সব রাজনৈতিক শক্তিই দুর্নীতিবিরোধী ব্যানারকে সমর্থন জানিয়েছে । এতে বিক্ষোভে ক্রস কাট্টিং অংশগ্রহণ দেখা যায়। কোনো একক দলের একচেটিয়া প্রভাব নেই।
পদত্যাগের পর কীভাবে সরকার গঠিত হবে?
নেপালের ২০১৫ সালের সংবিধান অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী পদ শূন্য হলে ৫৫ দিনের মধ্যে নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ–প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। প্রেসিডেন্ট হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে যে নেতা সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রমাণ দিতে পারে, তাকে আমন্ত্রণ করেন। যদি জোটগঠন ব্যর্থ হয়, তাহলে ধাপে ধাপে ৭৬(২), ৭৬(৩) ইত্যাদি অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিকল্প পথ সক্রিয় হয়; শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হলে হাউস ভেঙে নির্বাচনেও যেতে হতে পারে।
নেপালের সম্ভাব্য রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ
যত দ্রুত নতুন জোট সরকার গঠন করবে তত দ্রুত সহিংসতা কেমে আসবে। এজন্য প্রেসিডেন্ট একই সংসদ থেকেই এমন একজন নেতাকে মনোনীত করবেন, যিনি ১৩৮–এর বেশি এমপি সমর্থন দেখাতে পারেন। মাওবাদী এবং অন্যান্যদের মধ্যে যেকোনো নতুন সমঝোতা হতে পারে।
২০২৪ সালে দহল সরকারের পতনের পর ওলির উত্থান দেখিয়েছে যে সেখানে বড় দুই দলের সমঝোতা হলে দ্রুত সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া যায়।
চ্যালেঞ্জ: জনরোষ বহাল। “এলিট–ডিল”–কে তরুণরা গ্রহণ নাও করতে পারে। সোশ্যাল–মিডিয়া নীতির স্বচ্ছ রোডম্যাপ, স্বাধীন তদন্ত এবং পুলিশি জবাবদিহিতা ছাড়া সরকার জন্মলগ্নেই বৈধতা সংকটে পড়বে।
ন্যাশনাল ইউনিটি সরকার
প্রধান দলগুলো সময়সীমাবদ্ধ ন্যূনতম কর্মসূচিতে একমত হবে—যেমন:
(ক) সহিংসতার স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন,
(খ) ডিজিটাল রাইটস–ফ্রেমওয়ার্ক,
(গ) অ্যান্টি–করাপশন রিফর্ম,
(ঘ) নির্বাচনী সংস্কার/সময়সীমা নির্ধারণ।
আগাম নির্বাচন
৫৫ দিনের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথ না মিললে, বা ধারাবাহিক ভোটাভুটিতে ব্যর্থতা এলে—সংবিধানিক রূপরেখা অনুযায়ী হাউস ভেঙে আগাম নির্বাচন।
সুবিধা: নতুন ম্যান্ডেট; তরুণ ভোটারদের শক্তি প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা।
ঝুঁকি: স্বল্পমেয়াদে নীতিগত–আর্থিক অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগ ও পর্যটনে ধাক্কা; নির্বাচনী সহিংসতার ঝুঁকি; বিক্ষোভ–পরবর্তী পোলারাইজেশন বেড়ে গেলে ফলাফল খুব খণ্ডিত হতে পারে। ফলে আবারও জোট–ঝুঁকি সৃষ্টির আশঙ্কা থাকবে।
কেয়ারটেকার ধরনের অন্তর্বর্তী সরকার
দলগুলো একটি “নন–পার্টিজান” বা টেকনিক্যাল কেবিনেট–এ সমঝোতা করে সীমিত সময়ের জন্য কেবল ক্রাইসিস–ম্যানেজমেন্ট, অর্থনীতি স্বাভাবিকীকরণ, এবং নির্বাচনী প্রস্তুতি। এতে করে “নো–পলিটিক্স–আনটিল–ইলেকশন” বার্তায় উত্তেজনা কমতে পারে। তবে এরফলে গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন; রাজনৈতিক দলগুলো নীতিগত সংস্কারে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ওলির পদত্যাগ নেপালের জন্য কেবল একটি নেতৃত্ব–পরিবর্তন নয়; এটি ডিজিটাল অধিকার বনাম রাষ্ট্র–নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্নীতিবিরোধী জনআন্দোলন বনাম দলীয় এলিট পলিটিক্স এই দুই অক্ষের সংঘাতের ফল।







আপনার মতামত লিখুন