বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ড্রোন প্রযুক্তির হাল-হকিকত ও সম্ভাবনা
বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা হুমকি এবং প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির যুগে প্রবেশ করেছে দক্ষিণ এশিয়া। সামরিকভাবে অপেক্ষাকৃত ছোট রাষ্ট্র হয়েও বিশাল সম্ভাবনাময় ভূ-রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশ এখন চতুর্মূখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বাংলাদেশের নিকটতম কোন বন্ধু না থাকায় এবং শত্রুপ্রতিবেশির আগ্রাসী আচরণের কারণে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিন দিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে বাংলাদেশের আকাশসীমা রক্ষা, সীমান্তে প্রতিদিন ভারতীয় বাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশিদের হত্যার বদলা নেওয়া এবং আধুনিক যুদ্ধে টিকে থাকার প্রশ্নে বাংলােদেশকে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে । এখনকার পরিস্থিতি বলছে, ভবিষ্যতে আমাদের আরো অনেক বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।
সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এখনকার সময়ের খুবই গুরুত্বপূর্ণ দাবি। এই দাবিটা এখনই জোরদার করতে হবে এজন্য যে, এখন দেশের রাজনৈতিক দলগুলো একটি জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।এই সময়ের গণআকাঙ্খা এবং গণ-দাবিগুলোকে বিবেচনা করেই রাজনৈতিক দলগুলো আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য একটি উন্নয়নমূখী নতুন বাংলাদেশ বিনির্মানের ইশতেহার তৈরি পারবেন।
ড্রোন এখন আর শুধু একটি অস্ত্র বা প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নয়। এখন ড্রোন হচ্ছে এমন এক প্রতিরক্ষা দৃষ্টিভঙ্গির বিবর্তন, যা একটি দেশের জাতীয় শক্তির প্রতীক হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ এখনই সেই বিবর্তনের স্রোতে নিজেকে প্রস্তুত করতে না পারলে নানা দিক দিয়ে ক্ষতির সন্মুখীন হতে হবে।
ড্রোন প্রযুক্তি আজ শুধু নজরদারির জন্যই জরুরী নয়। ইলেকট্রনিক ওয়াফেয়ার, সার্ভেইলেন্স, টর্গেট একুইজেশন,স্ট্রাইক এবং সীমান্ত প্রতিরক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে ড্রোন বা আনম্যানড এরিয়াল ভেহিকেল (ইউএভি) প্রযুক্তি বিশ্বব্যাপী আকাশ প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন জাগে, বাংলাদেশ বিমানবাহিনী কীভাবে ড্রোন প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে তার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী ও আধুনিক করতে পারে ?
এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর বিদ্যমান পরিস্তিতি, বহুমূখী চ্যালেঞ্জ, সেইনব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার সমস্যা এবং সম্ভাবনা নিয়েই বিশ্লেষণ করা হয়েছে আজকের লেখায়।
প্রথমত : বাংলাদেশের আকাশ নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ
প্রথমত : ভারতের Su-30MKI বা রাফালে, মিয়ানমারের JF-17 ও চীনের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সামরিক যোগাযোগ। এগুলো বাংলাদেশের আকাশ নিরাপত্তাকে ক্রমেই জটিল করে তুলছে। সেই কারণে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস, চোরাচালান,এবং সীমান্ত উত্তেজনা মোকাবেলায় বাংলাদেশে ড্রোন প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
দ্বিতীয়ত : বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষার বর্তমান চিত্র
বাংলাদেশ এখনো পুরাতন মৌলিক যুদ্ধবিমান নির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনুসরণ করে। বাংলাদেশের রাডার কাভারেজ এখনো অসম্পূর্ণ। অনেক অঞ্চল কেবলমাত্র আংশিক পর্যবেক্ষণে থাকে।
বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর রোস্টারে রয়েছে MiG-29, F-7BG, Yak-130, K-8W প্রভৃতি বিমান। যদিও এগুলোর অনেকই আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে।
বাংলাদেশে ড্রোন ব্যবহারের পরিসর এখনো অত্যন্ত সীমিত। বাংলাদেশে এখন যে ভাবে ড্রোন ব্যবহার করা হয়, তা শুধুমাত্র নজরদারি এবং সীমান্ত টহলে সীমাবদ্ধ ।
তৃতীয়ত : বাংলাদেশের আকাশ নিরাপত্তার সম্ভাবনা
বাংলাদেশে ড্রোন প্রযুক্তির সামরিক ও প্রতিরক্ষা সম্ভাবনা অনেক বেশি। সীমান্ত পর্যবেক্ষণের জন্য MALE (Medium Altitude Long Endurance) ড্রোনের ব্যবহার কার্যকর ভুমিকা রাখতে পারবে।
নজরদারির জন্য তুরস্কের তৈরি Bayraktar TB2, Wing Loong HALE (High Altitude Long Endurance) গভীর নজরদারির জন্য MQ-9 Reaper Tactical UAV এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া, জ্যামিং সহনশীল Heron, ScanEagle Loitering Munition (কামিকাজে ড্রোন) ব্যবহার করা যেতে পারে।
টার্গেট হামলার জন্য Shahed-136, Switchblade. Micro/Nano Drones এবং শহুরে পর্যবেক্ষণের জন্য Black Hornet ড্রোন বাংলাদেশের কার্যকর আকাশ প্রতিরক্ষা গড়তে সক্ষম হতে পারে।
চতুর্থত : ড্রোন প্রযুক্তিতে আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার কৌশল
আইসআর (Intelligence, Surveillance & Reconnaissance) সক্ষমতা ও শক্তিমত্তা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশে বর্তমানে যেসব রাডার ব্যবস্থা রয়েছে, তা অনেকাংশে ম্যানুয়াল ও স্থির।
ড্রোন ব্যবহারে এ দুর্বলতা অনেকটাই কাটিয়ে ওঠার জন্য উঁচু এলাকা, দ্বীপ বা সীমান্তে যেমন: পার্বত্য চট্টগ্রাম বা সেন্ট মার্টিনে নজরদারি ড্রোন ব্যবহার করে Blind Spot কমানো যায়।
আকাশ হামলার আগাম সতর্কতা ও প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা অর্জনে আকাশ প্রতিরক্ষায় “Early Warning” অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেক্ষেত্রে বেয়রেক্টার টিবিটু বা Heron-এর মতো MALE ড্রোন ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় আকাশে থেকে নজরদারি চালাতে পারে। জলসীমা ও নদীবেষ্টিত অঞ্চলে হঠাৎ অনুপ্রবেশ বা অবৈধ অনুপ্রবেশ শনাক্ত করা সহজ হয়।
ইউএভি প্রযুক্তি দিয়ে যে শত্রু ড্রোন, হেলিকপ্টার বা যুদ্ধবিমান প্রবেশ করলে তা দ্রুত শনাক্ত করে প্রতিরোধ করা সম্ভব। ট্যাক্টক্যিাল ড্রোন দিয়ে কমব্যাট এয়ার প্যাট্রোল পরিচালনা করা সম্ভব। ইউএভি স্যাটেলাইট সমন্বিত প্রযুক্তি ব্যবহার করে অবিরাম নজরদারি ব্যবস্থাও গড়ে তোলা যেতে পারে।
ইসরায়েল ও ইউক্রেন যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে Loitering Munitions অত্যন্ত কার্যকর। বাংলাদেশ চাইলে সীমান্ত সংঘর্ষে দ্রুত প্রতিক্রিয়ার জন্য এমন ড্রোন মোতায়েন করতে পারে। নির্দিষ্ট অবস্থানে বসিয়ে রাখা এই ড্রোন প্রয়োজনে শত্রু অবস্থানে হামলা চালাতে পারে।
পঞ্চমত : ইউএভি এবং ম্যানড ফাইটার ইন্টিগ্রেশনের সম্ভাবনা
ভবিষ্যতের যুদ্ধ হবে Human-Machine Teaming ভিত্তিক। বাংলাদেশ এ প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে পারলে প্রতিটি বিমান স্কোয়াড্রনের সঙ্গে একটি করে Drone Wing সংযুক্ত করে Mission Efficiency বাড়ানো যাবে।
ট্রেইনিং ফ্লাইটে ইউএভি ব্যাবহার করে ‘লাইভ সিমুলেটেড অ্যাটাক’ এর ব্যবস্থা করা যাবে। কমব্যাট ট্রেইনিংয়ে ড্রোনের সহায়তায় পাইলটদের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আরও বাস্তব অভিজ্ঞতাও দেওয়া যাবে।
ষষ্টত : বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা
ভারত ইতোমধ্যেই রুস্তম এবং তাপস নামে নিজস্ব ড্রোন তৈরি করছে। মিয়ানমার চীন থেকে Wing Loong I/II ড্রোন নিচ্ছে এবং ইরান থেকেও সহযোগিতা নিচ্ছে।
চীন ও ভারতের মধ্যে ড্রোন প্রতিযোগিতার ফলে বাংলাদেশকে ভারসাম্যপূর্ণ, কার্যকর এবং স্বনির্ভর ইউএভি তৈরি করতে হবে। যাতে করে বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলায় সক্ষম থাকে।
সপ্তমত : দুর্বল পাইলট-ভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন
বাংলাদেশের বিমানবাহিনীতে প্রশিক্ষিত পাইলটের সংখ্যা সীমিত, যা Full-Scale Deployment-এ সমস্যা তৈরি করে। এই ঘাটতি ই্উএভি দ্বারা আংশিকভাবে পূরণ করা সম্ভব।
অষ্টমত : দ্বীপ ও উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ
বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিন, টেকনাফ ও বঙ্গোপসাগরের ওপর নজরদারিতে ইউএভি বড় ভূমিকা রাখতে পারে। মেরিটাইম ড্রোন সাভেইলেন্স বা সামূদ্রিক ড্রোন নজরদারি দিয়ে এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন রক্ষা করা সম্ভব। বঙ্গোপসাগরে চীনা বা ভারতীয় সামুদ্রিক ড্রোন, সাবমেরিন কিংবা মাছ ধরার জাহাজ পর্যবেক্ষণ সহজ হয়।
নবমত : কৌশলগত উন্নয়নের রূপরেখা: ইউএভি ইন্ট্রিগ্রেশন পরিকল্পনা
বিমান বাহিনীর ড্রোন স্কোয়াড্রন গঠন করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রত্যেক এয়ার বেসে কমপক্ষে একটি ইউএভি স্কোয়াড্রন গঠন। ম্যাল, ট্যাক্টিক্যাল ও লোইটারিং ড্রোন অন্তর্ভুক্ত করে হাইব্রিড স্ট্রাকচার গড়ে তোলাও জরুরী। সেই সঙ্গে দক্ষ ইউএভি পাইলট এবং ডেটা অ্যানালিস্ট নিয়োগ করাও জরুরী।
দশম : ড্রোন অপারেশন ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন
বাংলাদেশের আকাশকে সুরক্ষা দিতে হলে ইউএভি ও এআই নিয়ন্ত্রিত অপারেশনের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। বিদেশে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বাংলাদেশের বুয়েট,রুয়েট,এমআইএসটি ও বিমান বাহিনী একত্রে গবেষণা প্রতিষ্ঠান গঠন করা যেতে পারে।
একাদশতম : লোকাল প্রযুক্তির উন্নয়ন
জাতীয় প্রতিরক্ষা কোম্পানির বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি বা বিএমটিএফের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে নজরদারি ড্রোন উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। আইসিটি ডিভিশন ও বাংলাদেশ বিমানবাহিনী যৌথভাবে ড্রোন এআই ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করতে পারে
দ্বাদশতম : আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও রপ্তানিযোগ্য কৌশল
তুরস্ক ও দক্ষিণ কোরিয়া-র সঙ্গে যৌথ গবেষণা ও প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তি করা যেতে পারে। ওআইসি বা বিমসটেক প্ল্যাটফর্মে মিলিটারি টেক সহযোগিতা বাড়ানো যেতে পারে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনের জন্য নজরদারি ড্রোন তৈরি করে তা রপ্তানির মাধ্যমেও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি যেতে পারে।
বাংলাদেশ একটি উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে সামরিক প্রযুক্তিতে দীর্ঘদিন পিছিয়ে ছিল। কিন্তু বর্তমান যুগে ড্রোন প্রযুক্তি এমন এক ‘ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার’, যা সীমিত বাজেটেও আকাশ প্রতিরক্ষা, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে তুলতে পারে।
বাংলাদেশ বিমানবাহিনী যদি এখনই পরিকল্পিতভাবে নজরদারি, হামলা ও প্রশিক্ষণ-এই তিনটি ক্ষেত্রেই ‘ইউএভি’ সংহত করে, তাহলে এ দেশ ভবিষ্যতের আকাশযুদ্ধে বড় কৌশলগত সুবিধা অর্জন করতে পারবে।







আপনার মতামত লিখুন